Breaking News
Home / পাবনা সদর / একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক রণেশ মৈত্রের শেষকৃত্য সম্পন্ন

একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক রণেশ মৈত্রের শেষকৃত্য সম্পন্ন

রফিকুল ইসলাম সুইট : পাবনার সাংবাদিকদের অভিভাবক, ভাষা সৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, বর্ষিয়ান বাম রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, প্রখ্যাত কলাম লেখক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক, ঐতিহ্যবাহী পাবনা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও সভাপতি রণেশ মৈত্রের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে।
পাবনার অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শুক্রবার বিকেলে পাবনা মহাশ্মশানে তাঁর এই শেষকৃত্য নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যদিয়ে শেষ করা হয়। ২৬ সেপ্টেম্বর ভোর ৩.৪৭ মিনিটে ঢাকার পপুলার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
ঢাকাতে হিমঘরে মরদেহ রাখার পর শুক্রবার ভোরে পাবনার উদ্দেশ্যে রওনা হয় তাঁর মরদেহবাহি অ্যাম্বুলেন্সটি। দুপুর সোয়া ১ টার দিকে রণেশ মৈত্রের পাবনা শহরের বেলতলাস্থ বাসভবনে এসে পৌঁছায়। সেখান থেকে পারিবারিক কাজকর্ম শেষে দুপুর ২ টায় মরদেহ নেয়া হয় পাবনা শহরের বীরমুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল স্বাধীনতা চত্বরে। সেখানে ঘন্টাব্যাপী রাখা হয়।
পরে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার গার্ড অব অনার প্রদান করেন পাবনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তহমিনা আকতার রেইনা ও পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জুয়েল।
পরে ডেপুটি স্পীকার অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু এমপি, পাবনা সদর আসনের সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্স, জেলা পরিষদ প্রশাসক রেজাউল রহিম লাল, জেলা প্রশাসক বিশ্বাস রাসেল হোসেন, পুলিশ সুপার আকবর আলী মুন্সী, নব নির্বাচিত জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আসম আব্দুর রহিম পাকন, পৌর মেয়র শরীফ উদ্দিন প্রধান, অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরি, জেলা আওয়ামী লীগ, জেলা শিল্প কলা একাডেমী, পাবনা প্রেস ক্লাব, বাংলাদেশ জাসদের সহসভাপতি আমিরুল ইসলাম রাঙা, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠনসহ নানা শ্রেনিপেশার মানুষ ফুলের শ্রদ্ধাঞ্জলি জানান।
বিকেল তিনটায় তাঁকে আনা হয় তাঁর প্রাণের সংগঠন পাবনা প্রেসক্লাবে। সেখানে এক মিনিট নিরবতা পালন ও ফুলের শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানো হয়। এ সময় সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণ করেন পাবনা প্রেসক্লাব সভাপতি এবিএম ফজলুর রহমান, সম্পাদক সৈকত আফরোজ আসাদ, সিনিয়র সাংবাদিক আব্দুল মতীন খান, সাবেক সম্পাদক আঁখিনুর ইসলাম রেমন ও রণেশ মৈত্রের পুত্র প্রবীর মৈত্র।
সাড়ে তিনটায় তাঁকে নেয়া হয় পাবনা জয়কালী বাড়ি মন্দির প্রাঙ্গনে। ধর্মীয় আচার ও রীতিমতো পালনের পর তাঁকে নেয়া হয় পাবনা মহাশ্মশানে। সেখানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।
উল্লেখ ২৬ সেপ্টেম্বর ভোর ৩টা ৪৭ মিনিটে ঢাকার পপুলার হাসপাতালে বার্ধক্যজনিত রোগের চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। সম্প্রতি তিনি মফস্বল সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদান রাখায় বসুন্ধরা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন। মৃত্যুকালে স্ত্রী, দুই ছেলে. দুই মেয়েসহ অসংখ্য গুনগ্রাহী রেখে গেলেন।
জানা যায়, ১৯৩৩ সালের ৪ অক্টোবর রাজশাহী জেলার ন’হাটা গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পৈত্রিক বাসস্থান পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার ভুলবাড়িয়া গ্রামে। বাবা রমেশ চন্দ্র ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। সপ্তম শ্রেণিতে ওঠার পর থেকেই রণেশ মৈত্র টিউশনি করে নিজের লেখাপড়ার খরচ চালাতেন। নিজ জীবন সংগ্রাম থেকে শিক্ষা নিয়েই রণেশ মৈত্র দেশের অসহায়, শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের জন্য আন্দোলন ও সংগ্রাম করেন।
১৯৫০ সালে পাবনা জিসিআই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ১৯৫৫ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯৫৯ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫১ সালে সিলেট থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক নওবেলাল পত্রিকায় সাংবাদিকতার মাধ্যমেই তার সাংবাদিকতা জীবন শুরু। এরপর কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক সত্যযুগে তিন বছর সাংবাদিকতার পর ১৯৫৫ সালে তিনি যোগ দেন দৈনিক সংবাদে।
১৯৬১ সালে ডেইলি মর্নিং নিউজ এবং ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত দৈনিক অবজারভারে পাবনা প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯২ সালে দি নিউ নেশনের মফস্বল সম্পাদক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর ১৯৯৩ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দি ডেইলি স্টারের পাবনা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। পরে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নিয়ে একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে দেশের শীর্ষ পত্রপত্রিকায় কলাম লিখে সারাদেশে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছেন।
এছাড়া, ১৯৬১ সালে পাবনায় পূর্ব পাকিস্থান মফস্বল সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে গঠিত পূর্ব-পাকিস্থান সাংবাদিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই সম্মেলনের মাধ্যমে মফস্বল সাংবাদিকরা তাদের পেশার স্বীকৃতি পায়। সেই বছরেই প্রতিষ্ঠিত পাবনা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
এছাড়া তিনি দীর্ঘদিন প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে জেলার সাংবাদিকদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য তিনি ২০১৮ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হন।
১৯৪৮ সালে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে ভাষা আন্দোলনের মিছিলে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় রণেশ মৈত্রের রাজনৈতিক জীবন। একই সময়ে সাংবাদিকতা পেশায় জড়িয়ে পড়েন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে জেল খেটেছেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে তিনি পাবনা জেলার অন্যতম সংগঠক ছিলেন। সেই বছরেই তিনি ছাত্র ইউনিয়নের জেলা সাংগঠনিক কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ সালে এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে সাংস্কৃতিক সম্পাদক নির্বাচিত হন।
রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলন জোরদার করার লক্ষ্যে তিনি বাংলাদেশ অবজারভারের আব্দুল মতিন, কামাল লোহানীসহ প্রগতিশীল বন্ধুদের সঙ্গে গঠন করেন শিখা সংঘ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। সেখানে একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার ছিল, যেখান থেকে শিখা নামে একটি হাতে লেখা পত্রিকাও প্রকাশিত হতো। স্ত্রী পূরবী মৈত্র বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পাবনা জেলা শাখার সভাপতি। ৫ ছেলেমেয়ে সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।
গুণী এই ব্যক্তির পরলোকগমনে তাৎক্ষণিকভাবে পাবনার সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিকসহ নানা পেশাজীবী সংগঠন ও নানা শ্রেণিপেশার মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে শোক ও শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

Check Also

উন্নয়ন তরান্বিত করতে কর্ম চুক্তি সম্পাদন, সিটিজেন চার্টার, শুদ্ধাচার বাস্তবায়ন করতে হবে-জেলা প্রশাসক

রফিকুল ইসলাম সুইট : পাবনা জেলা প্রশাসক বিশ^াস রাসেল হোসেন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার …

সরকার শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে – এমপি প্রিন্স

মিজানুর রহমান: পাবনা সদর উপজেলার চর ঘোষপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নবনির্মিত ভবনের উদ্বোধন করা হয়েছে। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *